February 3, 2026, 1:47 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি যে গভীর সংকটে ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে, রাজস্ব ঘাটতি প্রকট, ব্যাংকিং খাতে অনাস্থা—এই বাস্তবতায় সরকার চালাতে গিয়ে ঋণ নেওয়া অনেকাংশেই অনিবার্য ছিল। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন “অনিবার্যতা” ধীরে ধীরে নীতিতে পরিণত হয় এবং ঋণ হয়ে ওঠে সহজ সমাধান।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে কৃচ্ছ্রসাধন ও ঋণনির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ ১৮ মাস পেরোতেই দেখা যাচ্ছে, এই সময়কালে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সময়ের বিচারে এটি অতীতের যেকোনো সরকারের তুলনায় বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে—এই ঋণ কি অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে নিয়েছে, নাকি কেবল সময় কিনে দিয়েছে?
অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সরকারের আমলের লুটপাট ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল। সেখানে সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই সরকারের সময় নেওয়া বহু প্রকল্প বহাল রেখেই বরং ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, পুনর্মূল্যায়ন ও ব্যয় সংশোধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত লাখ লাখ কোটি টাকা যুক্ত হয়েছে। এতে প্রশ্ন জাগে—নীতিতে পরিবর্তন হলো, নাকি কেবল শাসকের নাম বদলাল?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নেওয়া ঋণের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে উন্নয়ন খাতে নয়, বরং পরিচালন খাতে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধেই রাজস্বের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে। উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় যখন বেশি হয় এবং সেই ব্যবধান পূরণ করতে ঋণ নিতে হয়, তখন সেটি অর্থনীতির জন্য সুস্থ লক্ষণ নয়—বরং তা ভবিষ্যৎ সংকটের পূর্বাভাস।
এ অবস্থায় বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকায় বিদেশী ঋণের সুদহার বাড়ছে, শর্ত কঠোর হচ্ছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা থেকে শুরু করে এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে “ঋণের ফাঁদে পড়ার” কথা বলছেন। কিন্তু সতর্কবার্তা উচ্চারিত হলেও বাস্তব নীতিতে তার প্রতিফলন সীমিত। বিদেশী ঋণ শুধু অর্থ নয়, এর সঙ্গে আসে সংস্কার, শর্ত এবং নীতিগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা—যার বোঝা ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে বইতে হবে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়। সরকারের ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, সেই অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়ছে না। ফলে একদিকে ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে ঋণ শোধের সক্ষমতা দুর্বল থাকছে। এই চক্র চলতে থাকলে সামনে হয় কর বাড়াতে হবে, নয়তো ভর্তুকি কমাতে হবে—দুই ক্ষেত্রেই চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল তার অরাজনৈতিক চরিত্র। কঠিন ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এ সময়টাই ছিল সবচেয়ে উপযোগী। ব্যয় সাশ্রয়, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল, রাজস্ব সংস্কারে দৃঢ় পদক্ষেপ—এসব করলে হয়তো ঋণের চাপ কিছুটা হলেও কমানো যেত। সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি বলেই আজ নতুন রাজনৈতিক সরকারের জন্য একটি ভারী অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার তৈরি হচ্ছে।
ঋণ নিয়ে সংকট সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু ঋণ দিয়ে সংকটের সমাধান হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়েছে বলে দাবি করা যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি অনেকটা ঋণ দিয়ে সময় কেনার কৌশল বলেই মনে হচ্ছে। সেই সময় শেষ হলে অর্থনীতির সামনে যে কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে, তার দায় তখন আর শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের থাকবে না—তা বহন করতে হবে পুরো রাষ্ট্রকেই।